রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞালংকার ভিক্ষুর প্রতি খোলা চিঠি
রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞালংকার ভিক্ষুর প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন ব্যক্তিবর্গের খোলা চিঠি...
পূজনীয় ভান্তে,
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশ তথা পুরো বিশ্বের সকল মানুষের এক মহাদুর্যোগের মুহুর্তে আপনার মাধ্যমে আমরা রাজবন বিহারের ভিক্ষুসংঘ, উপাসক উপাসিকা কার্য নির্বাহী পরিষদ এবং সকল ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিকট আমাদের কিছু কথা উপস্থাপন করতে চাই।
ভান্তে, আপনি জানেন, বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়ে এক অস্থির সময় উপস্থিত হয়েছে। সামাজিক জীব হিসেবে পরিচিত মানুষ আজ সামাজিক দূরত্ব নামক বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়ছে। এ বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর থেকে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। সে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। দেশের সকল অফিস-আদালত, স্কুল--কলেজ-বিশ্ববিদালয়, কল-কারখানাসহ সকল ধরণের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। গণজমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
দেশের এই অবস্থায় সমতল হতে বিভিন্ন কল-কারখানার কর্মজীবীরা আজ জীবন-জীবিকার ক্ষতির আশঙ্ক্ষায় নিজ নিজ এলাকায় ফিরে আসছে। আপনি জেনে আশ্বস্ত হবেন যে সেসব মানুষদের সুষ্ঠু কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে কোভিড ১৯ এর মত রোগ যেন প্রকট আকারে না ছড়ায় সে জন্য সকল মহল সচেতন রয়েছেন।
ভান্তে, আপনি জানেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি মানুষদের কথা। এই অঞ্চল এখনো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নয়। শহরকেন্দ্রীক একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি মোটামুটিভাবে গড়ে উঠলেও উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এখনো মানুষ দিনে আনে দিনে খায়। শারীরিক শ্রম নির্ভর আয়ের উপর ভিত্তি করে পাহাড়ের এই মানুষগুলো এতদিন ধরে জীবন সংগ্রামে রত ছিল। কিন্তু কোভিড ১৯ ভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় বর্তমানে সেসব মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনের খাবার ঠিকমতো জুটছে না। দু মুঠো খাবারের জন্য তাদের হাহাকার এখন পুরো পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কারখানায় কর্মজীবী মানুষগুলোও ঠিকমতো বেতন পায় নি। সামনের কয়েক মাস হয়তো তারা কোন বেতনই পাবেন না। ফলে মানবেতর দিন কাটাতে হবে তাদের। সীমান্তবর্তী অনেক অঞ্চলে ইতোমধ্যেই সীমিত পর্যায়ে ত্রাণ কার্যক্রম চলছে কিন্তু অর্থের অভাবে পুরোপুরি সফল করা যাচ্ছে না। কারণ এই ভাইরাসের প্রকোপ সর্বস্তরের ও সকল শ্রেণির মানুষের উপর পড়ছে। ফলে, আর্থিক সহায়তার পদক্ষেপগুলো আর সেভাবে সফল হচ্ছে না।
ভান্তে, ২০১৯ সালের ২৪ আগস্ট রাজবন বিশ্বশান্তি প্যাগোডা নির্মাণের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। এরপর আপনারা প্যাগোডা নির্মাণকল্পে মাসিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দানকারী সদস্য নিবন্ধন করছেন যার সদস্য সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্যাগোডা নির্মাণের কাজ জোরেসোরে শুরু হয়েছে।
কিন্তু ভান্তে, বতর্মান এই অস্থির ও অভাবের সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আমরা আপনার নিকট আর্জি জানাই নির্মাণ কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে প্যাগোডা নির্মাণের ফান্ড থেকে কিছু অর্থ ত্রাণকার্যে সহায়তাকারী বিভিন্ন সংগঠনে প্রদানের জন্য। এতে হাজার মানুষের মুখে দুবেলা কিছু আহার জুটবে। বৌদ্ধ ধর্ম মানব মুক্তির ধর্ম, মানব কল্যাণের ধর্ম, এই বিশ্বাসটুকু আজ সকলের মাঝে আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার এটি একটি মোক্ষম সময়।
যেটুকু অর্থ সহায়তা প্রদান করা হবে, ভবিষ্যতে সেটুকু অর্থ শ্রদ্ধাদান প্রদানকারীদের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পূরণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছু অর্থের অভাবে হাজার মানুষের জীবন ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা কোন কিছুর মাধ্যমে পূরণযোগ্য নয়।
ভান্তে, আমরা তাই আপনার মাধ্যমে বনভিক্ষু সংঘ, সকল বন বিহার, সকল উপাসক-উপাসিকাদের মাধ্যমে এই বার্তা দিতে চাই, একসময় মর্ত্যলোকের অভাব-দুঃখ-কষ্ট-মৃত্যু দেখে ভগবান গৌতম বুদ্ধ নিজের ও মানব কল্যাণের জন্য গৃহত্যাগ করেছিলেন, বর্তমান সময়েও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের দুঃখ-কষ্টের দিকে তাকিয়ে সমুদয় অর্থ প্রদানের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষদের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসুন।
ত্রিরত্ন আমাদের সকলের মঙ্গল করুক।
ইতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন ব্যক্তিবর্গ
_______________________________

No comments