কল্পনা চাকমা অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন।


আজ ১২ জুন ২০১৯ সকাল ১০ ঘটিকায় কল্পনা চাকমা অপহরণ দিবস উপলক্ষ্যে জনসংহতি সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শরৎ জ্যোতি চাকমা। পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সহ-সভাপতি সোনারাণী চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সভাপতি রিনা চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রামভাই পাংখোয়া; পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাগর ত্রিপুরা নান্টু প্রমুখ।
প্রধান অতিথি বক্তব্যে শরৎ জ্যোতি চাকমা বলেন, বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ণ, নির্যাতন ও বৈষম্য নীতির কারণে আজ ২৩ বছরেও রাষ্ট্র কল্পনা চাকমার হদিশ দিতে পারেনি। এটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং দেশের নারী সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের চরম অবহেলা ও বঞ্চনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি আরো বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বিদ্যমান থাকলে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের শিকার হতে হতো না। দীর্ঘ ২৩ বছরে তদন্ত কমিটি বারবার রদবদল হয় কিন্তু তদন্তের কোন সুরাহা হয় না। অবিলম্বে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত এবং যথাযথ বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, অভিযুক্ত কল্পনা চাকমা অপহরণকারীদের এবং রূপন, সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ পার্বত্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন দিবাগত রাতে রাঙ্গামাটি জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউলাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে পার্শ্ববর্তী কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লেঃ ফেরদৌসের নেতৃত্বে একদল ভিডিপি ও সশস্ত্র দুর্বৃত্ত কর্তৃক নির্মমভাবে অপহরণ করা হয়। কল্পনা অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে ডাকা ২৭ জুন ১৯৯৬ অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ চলাকালে আবার তৎকালীন বাঘাইছড়ি সেনা কর্তৃপক্ষের মদদে স্থানীয় ভিডিপি ও সেটেলারদের সাম্প্রদায়িক হামলায় বাবুপাড়া ও মুসলিম ব্লক এলাকায় গুলি করে রূপন চাকমাকে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

এই সে কল্পনা চাকমা'র অপহরণকারী। এই সেনা কর্মকর্তা লে. ফেরদৌস, ভিডিপি কমাণ্ডার নুরুল হক ও পিসি সালেহ আহম্মদ’র নেতৃত্বে অপহৃত হয়েছিলেন কল্পনা


কল্পনা অপহরণ ঘটনার পর দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও নিন্দার মুখে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও বিগত ২৩ বছরেও সরকার সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। অপহরণ ঘটনার পরপরই কল্পনার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমার অভিযোগ স্থানীয় বাঘাইছড়ি থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার প্রায় ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে ঘটনার বিষয়ে পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট পেশ করা হলেও সেই রিপোর্টে অভিযুক্ত ও প্রকৃত দোষীদের সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা আদালতে উক্ত চূড়ান্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দাখিল করেন। এরপর বাদীর নারাজী আবেদনের প্রেক্ষিতে ২ সেপ্টেম্বর ২০১০ শুনানী শেষে মামলার বিষয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত সিআইডি পুলিশকে নির্দেশ দেন। এরপর আদালতের নির্দেশে একে একে চট্টগ্রাম জোন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কয়েকজন পুলিশ সুপার রাঙ্গামাটির চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একের পর এক ‘তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন’ দাখিল করেন। কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনা ও মামলার বিশ বছর ও পাঁচ মাসের অধিক সময় পর গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ মামলার ৩৯তম তদন্ত কর্মকর্তা রাঙ্গামাটির তৎকালীন পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ তাঁর চূড়ান্ত রিপোর্ট রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কগনিজেন্স আদালতে দাখিল করেন। কল্পনা অপহরণ মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা ইতোমধ্যে উক্ত ৩৯তম তদন্তকারী কর্মকর্তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং মামলার কার্যক্রম বন্ধ রাখার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেছেন এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এবিষয়ে আদালত গত ৮ জুন ২০১৭ প্রথম শুনানির আয়োজন করেন এবং নারাজির উপর পুলিশের প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে আদালত একের পর এক শুনানির দিন ধার্য করলেও পুলিশ এ বিষয়ে বার বার প্রতিবেদন দাখিলে অপারগতা প্রকাশ করে ক্রমাগত সময় চাইতে থাকেন। এ বিষয়ে আদালত কর্তৃক আগামী ৩ জুলাই ২০১৯ আবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক ১২ জুন ২০১৯, কল্যাণপুর, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত  লিফলেট –

কল্পনা চাকমা অপহরণের ২৩ বছর

অপহরণ ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও যথাযথ বিচার চাই
অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

কল্পনা চাকমা অপহরণের দীর্ঘ ২৩ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ২৩ বছরেও বাংলাদেশ রাষ্ট্র কল্পনা চাকমার হদিশ দিতে পারেনি। যথাযথ বিচার করতে পারেনি মানবতা বিরোধী এই জঘন্য ঘটনার। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের বিচারহীনতার একটি হীন দৃষ্টান্ত। এটাই এ দেশের নারী সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের চরম অবহেলা ও বঞ্চনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্ট’ নীতির এটি একটি জঘন্য পরিহাস! এটাই দেশের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্য ও উপেক্ষার খন্ডচিত্র। এটাই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি রাষ্ট্রের নির্লজ্জ দায়মুক্তির জ্বলন্ত প্রমাণ। এটাই আঙ্গুল দিয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেয় সামরিক যাঁতাকলে চরমভাবে পিষ্ট জুম্ম অধ্যুষিত এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটাই প্রমাণ করে যে, ভূমি বেদখল, জুম্মদেরকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণ, সর্বোপরি জুম্ম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত পরিণত করার জন্য জঘন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে জুম্ম নারীর উপর জঘন্য সহিংসতা, অপহরণ, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা করার মতো নৃশংসতাকে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন দিবাগত রাতে রাঙ্গামাটি জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউলাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে পার্শ্ববর্তী কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লেঃ ফেরদৌসের নেতৃত্বে একদল ভিডিপি ও সশস্ত্র দুর্বৃত্ত কর্তৃক নির্মমভাবে অপহরণ করা হয়। কল্পনা অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে ডাকা ২৭ জুন ১৯৯৬ অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ চলাকালে আবার তৎকালীন বাঘাইছড়ি সেনা কর্তৃপক্ষের মদদে স্থানীয় ভিডিপি ও সেটেলারদের সাম্প্রদায়িক হামলায় বাবুপাড়া ও মুসলিম ব্লক এলাকায় গুলি করে রূপন চাকমাকে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। কল্পনা অপহরণ ঘটনার পর দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও নিন্দার মুখে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও বিগত ২৩ বছরেও সরকার সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। 

অপহরণ ঘটনার পরপরই কল্পনার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমার অভিযোগ স্থানীয় বাঘাইছড়ি থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার  প্রায় ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে ঘটনার বিষয়ে পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট পেশ করা হলেও সেই রিপোর্টে অভিযুক্ত ও প্রকৃত দোষীদের সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা আদালতে উক্ত চূড়ান্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দাখিল করেন। এরপর বাদীর নারাজী আবেদনের প্রেক্ষিতে ২ সেপ্টেম্বর ২০১০ শুনানী শেষে মামলার বিষয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত সিআইডি পুলিশকে নির্দেশ দেন। এরপর আদালতের নির্দেশে একে একে চট্টগ্রাম জোন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কয়েকজন পুলিশ সুপার রাঙ্গামাটির চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একের পর এক ‘তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন’ দাখিল করেন। নামে এগুলো ‘তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন’ হলেও বাস্তবে তদন্তে কোন কিছুই অগ্রগতি নেই। 
কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনা ও মামলার বিশ বছর ও পাঁচ মাসের অধিক সময় পর গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ মামলার ৩৯তম তদন্ত কর্মকর্তা রাঙ্গামাটির তৎকালীন পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ তাঁর চূড়ান্ত রিপোর্ট রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কগনিজেন্স আদালতে দাখিল করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তাঁর রিপোর্টেও পূর্বের রিপোর্টের বক্তব্যগুলো চর্বিতচর্বন করে প্রকৃত পক্ষে দোষীদের ও অভিযুক্তদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালানো হয় এবং ‘...সার্বিক তদন্তে লেঃ ফেরদৌস, ভিডিপি নূরুল হক ও পি.সি সালেহ আহমেদের উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি’ বলে দাবি করা হয়। এমনকি রিপোর্টে ‘কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছে মর্মে প্রাথমিকভাবে সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়’ বলে স্বীকার করা হলেও ‘দীর্ঘ ২০ বৎসর ৩৯ জন তদন্তকারী অফিসারের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কল্পনা চাকমাকে অদ্যাবধি উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই এবং অদূর ভবিষ্যতেও সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ’ বলে দায়িত্বহীন ও হতাশাব্যঞ্জক বক্তব্য প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ‘ভবিষ্যতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া গেলে বা তাহাকে উদ্ধার করা সম্ভব হইলে যথানিয়মে মামলাটির তদন্ত পুনরুজ্জীবিত করা হইবে’ বলে প্রকারান্তরে মামলার কার্যক্রম বা তদন্ত কাজ বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়।

বলাবাহুল্য, কল্পনা অপহরণ মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা ইতোমধ্যে উক্ত ৩৯তম তদন্তকারী কর্মকর্তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং মামলার কার্যক্রম বন্ধ রাখার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেছেন এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এবিষয়ে আদালত গত ৮ জুন ২০১৭ প্রথম শুনানির আয়োজন করেন এবং নারাজির উপর পুলিশের প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে আদালত একের পর এক শুনানির দিন ধার্য করলেও পুলিশ এ বিষয়ে বার বার প্রতিবেদন দাখিলে অপারগতা প্রকাশ করে ক্রমাগত সময় চাইতে থাকেন। এ বিষয়ে আদালত কর্তৃক আগামী ৩ জুলাই ২০১৯ আবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

উল্লেখ্য যে, কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনাটি একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ও দেশের আদিবাসী নারীদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও সহিংসতার এক জ্বলন্ত প্রতীক। বস্তুত এটা সত্য যে, কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনাটি আজ ২৩ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও এই রাষ্ট্র, সরকার, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগ, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কেউই কল্পনা চাকমার হদিশ দিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, পারেনি অভিযুক্ত অপহরণকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে, এই রাষ্ট্র কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে তথা ঘটনার সুবিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। অপরদিকে কল্পনা অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে আহুত অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ চলাকালে সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমাকে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রেও সরকার বা প্রশাসন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। 

আরও উল্লেখ্য যে, শুধু কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনা নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধান এবং পার্বত্য অধিবাসীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও চুক্তিটি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় বিশেষত সেটেলার বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা বহু জুম্ম নারী যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। কেবল ২০১৮ সালে ৫৩ জন আদিবাসী নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। তার মধ্যে ১৮ জন নারীকে ধর্ষণ, ১২ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ১১ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ওরাছড়ি গ্রামে সেনাসদস্য কর্তৃক যৌন সহিংসতার শিকার দুই মারমা কিশোরী বোনকে পুলিশী প্রহরায় অন্তরীণ রেখে ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। ২২ আগস্ট ২০১৮ তারিখে বান্দরবানের লামা উপজেলার রামগতি গ্রামে বিজিবি তিন সদস্য কর্তৃক দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণের ঘটনাও একই কায়দায় ভিকটিমদের গ্রামে বন্দী করে রেখে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারীদের চরম অমর্যাদা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা সৃষ্টি করার চিত্র ফুটে উঠেছে। বস্তুত কল্পনা চাকমার চলমান তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া এ দেশের অন্যায়-অবিচার ও অপরাধের বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিকেই অত্যন্ত প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে এবং জাতিগত সংখ্যালঘু আদিবাসীদের প্রতি চরম নির্যাতন ও বৈষম্যকে উন্মোচিত করেছে। 

সরকার বর্তমানে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম সর্বাত্মকভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিণত করার পাকিস্তানী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। জঘন্য এই বর্ণবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দল, সেটেলার বাঙালি সংগঠন, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিকে ব্যবহার করা থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সংস্কারপন্থী সশন্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ও আরাকান লিবারেশন পার্টি (মগ পার্টি) নামক বিদেশী সশন্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজি তৎপরতায় আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। অপরদিকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও ভূমি অধিকারসহ মৌলিক অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনরত ব্যক্তি ও সংগঠনসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যদেরকে ‘সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে চুক্তি-পূর্ব সময়ের মতো তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের, ধর-পাকড়, ঘরবাড়ি তল্লাসী, ক্যাম্পে নিয়ে মারধর, জেলে প্রেরণ ইত্যাদি দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। ফলে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে এক শ্বাসরুদ্ধকর নিরাপত্তাহীন জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

বলাবাহুল্য এ সমস্ত কোন সহিংস ঘটনার জন্য রাষ্ট্র, সরকার, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনী কেউ এর দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারে না। দায়সারা বক্তব্য ও ভূমিকা গ্রহণ করে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার মত বর্বরোচিত ও জঘন্য মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার ন্যায়বিচার ব্যর্থ হতে পারে না। দোষীদের চিহ্নিত করে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্র, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই তা নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত না হওয়া ও চুক্তির আলোকে এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন কার্যকর না হওয়ার কারণে এবং বিচার বিভাগ সামরিক শাসনের নিয়ন্ত্রণাধীনে রাখার কারণে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও জুম্ম নারী তথা আদিবাসী নারীর উপর নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি এখনও অব্যাহত রয়েছে। তাই কল্পনা অপহরণ ঘটনার সুবিচার নিশ্চিতকরণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর সমমর্যাদা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তার স্বার্থে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের নিকট নিম্নোক্ত দাবি জানাচ্ছি-
● অবিলম্বে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কর এবং যথাযথ বিচার নিশ্চিত কর।
● অভিযুক্ত কল্পনা অপহরণকারীদের এবং রূপন, সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ কর।
● জুম্ম নারী সমাজের নিরাপত্তা ও অগ্রগতিসহ পার্বত্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন কর।
.............................................................................................
পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক ১২ জুন ২০১৯, কল্যাণপুর, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত

No comments

Powered by Blogger.